Home » Slider » সখীপুরে করোনা যুদ্ধে জয়ীদের গল্প। ‘মমতার দাওয়াই’ নামক অস্ত্র দিয়ে করোনাকে বধ করেছে ওরা।’

সখীপুরে করোনা যুদ্ধে জয়ীদের গল্প। ‘মমতার দাওয়াই’ নামক অস্ত্র দিয়ে করোনাকে বধ করেছে ওরা।’

ইকবাল গফুর :
টাঙ্গাইলের সখীপুরে ‘মমতার দাওয়াই’ নামক অস্ত্র দিয়ে করোনাকে রীতিমত বধ করেছেন একই পরিবারের পাঁচজনসহ ওরা ছয়জন। তাঁদের দ্বিতীয় দফায় করা পরীক্ষার ফলাফল ‘নেগেটিভ’ আসায় তাঁদের সুস্থতা ঘোষণা করেন উপজেলা স্বাস্থ্যবিভাগ। ফলে সখীপুরে মোট ছয়জন আক্রান্তের সবাই এখন সুস্থ। আজ শনিবার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবদুস সোবহান এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
সুস্থ হওয়া ব্যক্তিরা বলেন, তাঁদের শরীরে করোনাভাইরাসের কোনো উপসর্গ ছিল না। তাঁরা কোনো হাসপাতালে ভর্তিও ছিলেন না। বাড়িতে থেকেই তাঁরা সুস্থ হয়েছেন। তাঁদের দাবি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমাউল হুসনা লিজার ‘মমতার দাওয়াই’ তাঁর দেওয়া সাহস, তাঁর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী চলায় (প্রেসক্রিপশন) তাঁরা এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। এছাড়াও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুস সোবহান, আবাসিক মেডিকেল অফিসার শাহিনুর আলম, যাদবপুর ইউপি চেয়ারম্যান আতোয়ার রহমান সব সময় তাদের পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন।
এবার শোনা যাক যুদ্ধ জয়ের সেই গল্পের পটভূমি :
গত ২৪ এপ্রিলের কথা। টাঙ্গাইলের সখীপুরে সর্বপ্রথম এক পরিবারের পাঁচজনেরই করোনা শনাক্ত হয়। পরিবারটির প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেন এলাকার অনেকে। অনেকে ইউএনওকে ফোন দিয়েও পরিবারটিকে শায়েস্তা করার কথা বলেন। ইউএনও ঘটনাস্থলে যান ঠিকই। কিন্তু পরিবারটির জন্য ‘মমতার দাওয়াই’ নিয়ে এবং অসহিষ্ণু লোকজনের মানসিকতা পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে। সেইদিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমাউল হুসনা ওই আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাড়িতে যান। সঙ্গে নিয়ে যান এক ঝুড়ি ফল ও পাঁচ সদস্যের পরিবারের জন্য দুই সপ্তাহের খাদ্যসহায়তা। এলাকাবাসীর মানসিকতার পরিবর্তন ও রোগীর প্রতি মমত্ববোধ বাড়াতে বাড়ির সামনে ওইদিন একটি ব্যানার টাঙিয়ে দেন ইউএনও। তাতে লেখা ছিল, ‘করোনাভাইরাস অতিমাত্রায় ছোঁয়াচে রোগ, কিন্তু মরণব্যাধি নয়। সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব রক্ষা করে রিপন মিয়ার পরিবারকে সুস্থ হতে সহায়তা করুন। রোগীর প্রতি মানবিক আচরণ করুন।’ ইউএনও ওই বাড়িতে নিয়ে যাওয়া ফলের ঝুড়িতে একটি চিরকুট লিখে আসেন। তার শিরোনাম ছিল ‘মমতার দাওয়াই’। তাতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে লেখা হয়, ‘মনে সাহস রাখবেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার আপনার পাশে আছেন।’ এ মানবিক বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘ইউএনও দিলেন মমতার দাওয়াই’ শিরোনামে প্রচার হওয়া সংবাদটি বেশ আলোড়িত হয়। ২৭ এপ্রিল প্রথম আলোতে ‘মমতার দাওয়াই, ভুলের বিরুদ্ধে দারুণ সঠিক’ শিরোনামে এ নিয়ে সম্পাদকীয়ও হয়।
উপজেলার শোলা প্রতিমা গ্রামের একই পরিবারের করোনা জয়ী পাঁচজনের কর্তা রিপন মিয়া (৪৫) বলেন, ২৩ এপ্রিল রাতে স্ত্রী, এক মেয়ে ও দুই ছেলে আক্রান্তের খবর পেয়ে আমরা সবাই কান্নাকাটি শুরু করি। হতাশ হয়ে পড়ি। মনে হলো আমরা হয়তো কিছুদিন পরে মারা যাব। আমাদের হয়তো ঢাকার হাসপাতালে পঁচে-গলে মরতে হবে। প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনেরাও দূরে চলে গেল। পারলে তাঁরা আমাদের অপরাধী ভেবে মেরে ফেলে। পরদিন উপজেলা প্রশাসন আমাদের বাড়ির সামনে এল। মাইকে তাঁরা বলল, আপনারা বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নেবেন। আপনারা ভয় পাবেন না। আমরা প্রশাসন আপনার পাশে আছি। আপনাদের খাবার ওষুধপত্র, ফলমূল কোনো কিছুরই অভাব হবে না। মনে সাহস রাখবেন। চিকিৎসকের পরামর্শে চলবেন। নামাজ পড়বেন। আশা করি আপনারা সুস্থ হবেন।
তিনি আরও বলেন, ইউএনও ম্যাডাম আবার ওইদিন বিকেলেই আমাদের বাড়িতে এক ঝুড়ি ফল ও ১৫ দিনের চাল-ডাল দিয়ে আসেন। তিনি ওই ঝুড়িতে একটি প্রেসক্রিপশন (পরামর্শপত্র) রেখে যান। সেখানে ১৬টি পরামর্শ ছিল। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নিয়মিত সহনীয় গরম পানি দিয়ে গোসল করবেন, লেবুর শরবত খাবেন, ব্যায়াম করবেন, দিনে কমপক্ষে চারবার লবন মেশানো গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করবেন, চা খাবেন, দুশ্চিন্তা করবেন না, হাসিখুশি থাকবেন। প্রতিদিন একটি করে ডিম খাবেন। ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খাবেন। রোদে দাঁড়িয়ে ভিটামিন ‘ডি’ নেবেন। নামাজ পড়ে রোগমুক্তির জন্য দোয়া করবেন। শারীরিক সমস্যা হলে ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন (ডাক্তারের নম্বর দেওয়া ছিল)।
পরে ইউএনও ম্যাডামের পরামর্শ অনুসারে চলায় ও সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিয়ে আমাদের সাহস দেওয়ায়, কোন প্রকার ওষুধ ছাড়াই আমরা সুস্থ হয়েছি। এছাড়াও আমাদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান সাহেব আমার বাড়িতে সবজি, মাছ, চাল ডাল ইত্যাদি পাঠিয়ে দিতেন। টেলিফোনে প্রতিদিন খোঁজখবর নিতেন।
সখীপুর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বেসরকারি মাইক্রোবাস চালক সোনামিয়া (৩৫) গত ২৬ এপ্রিল করোনায় আক্রান্ত হন। তিনি গত সাতদিন আগেই সুস্থ হয়েছেন। দ্বিতীয় দফায় তাঁর নমুনা প্রতিবেদন নেগেটিভ আসায় তাঁকেও চুড়ান্ত সুস্থতা ঘোষণা করা হয়।
তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আমার মা চাকরি করেন। উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্যবিভাগ আমার খোঁজ-খবর নেওয়ায় ও মনোবল বাড়াতে সাহস দেওয়ায় আমি সুস্থ হয়েছি। আমার শরীরেও কোন উপসর্গ দেখা দেয়নি। আমি বুঝতেই পারিনি যে আমার এতবড় রোগ হয়েছিল।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমাউল হুসনা লিজা বলেন, আক্রান্তরা কোনো অপরাধী নয়, তাঁরা বৈশ্বিক মহামারির শিকার। তাঁদের প্রতি মানবিক হলে, তাঁদের মনের জোর বৃদ্ধির জন্য পাশে থেকে সাহস দিতে পারলে অনেকটাই এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আমি চেষ্টা করেছি, এ দুঃসময়ে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে। একই পরিবারে পাঁচজন হওয়ায় তাঁদের খোঁজ-খবর নেওয়া আমার জন্য সহজ ছিল।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবদুস সোবহান বলেন, ওই ছয় করোনা রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এ উপজেলাতে এ পর্যন্ত ২৫২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২৪৬ জনের ফলাফলে নেগেটিভ এসেছে। উপজেলায় এখন আর কোনো কারোনা আক্রান্ত রোগী নেই।

Leave a Reply

error: Content is protected !!